পূর্ণিমা রাত্রের বিশাল গোলগাল রূপোর থালার মতো চাঁদ দেখে আনোয়ার চেয়েছিলো ওটা যদি ফুটবল হতো, পায়ে নিয়ে একটা মোক্ষম লাথি মেরে মাঠের বাইরে না দিয়ে একেবারে গোলকিপারের চোখ ফাঁকি দিয়ে ওই পাহারা দেওয়া খাঁচায় পাঠিয়ে দিতো, কিন্তু চাঁদটা অদৃশ্য একটা গোলাকার জাতীয় বস্তু বলে ধরা-ছোঁয়া যাবে না, মই দিয়েও নাগাল পাওয়া যাবে না। আনোয়ার ভাবতে পারে না কিছুই, তারপরও চাঁদটার প্রতি দুর্বলতা রয়েছে, জন্মাবধি দেখতে দেখতে মন খানিকটা বিষিয়ে গেছে, পূর্ণিমায় ডগমগ করে আবার অমাবস্যায় কোথায় যে পালিয়ে যায়, কোথায় যে মুখ লুকোয় খুঁজে পাওয়া যায় না, এমন কেনো হয় বোঝে না, রানীবাজারের চিনিপট্টি গলির চাঁদ যেন অনেকদিন পর জামাইবাবাজির শ্বশুরবাড়ি আসা, তারপর আবার চলে যাওয়া, কেউ দেখতে পায় কেউ পায় না।
আনোয়ার ভাবছে কোথায় যাবে সে, গতরাত্রে মায়ের জ্বর ভীষণভাবে শরীর কাঁপিয়ে এসেছিলো, হোমিওপ্যাথি ভালো ধরে বলে ওটাই এনে দিয়েছে মোড়ের ডানদিকের ওই বাঁকারির বেড়া দেওয়া ডাক্তারখানা থেকে, কপালে হাত দিয়ে দেখে পুড়ে যাচ্ছে তাবৎ শরীর, বড়ই শক্ত মানুষ মা, সহজে ভেঙে পড়ে না, এটুকু জীবনে আনোয়ার তো দেখছে কতো ঝড়-বাদল মায়ের ওপর দিয়ে গেলো কিন্তু মা অটল-অবিচল এখনো, না ভেঙে পড়েনি, মুখ বুজে সহ্য করতে পারে সবই। আজ দুই মাসের বেশি হলো সৎ বাপটা মরে যাওয়া, মানুষটা বড় ভালোবাসতো ওকে, ভালোমানুষ ছিলো সন্দেহ নেই, কিন্তু কঠিন ব্যামো ছাড়লো না, চলে গেলো একেবারে, কাদিরগঞ্জ গোরস্থানে বাপের খাটিয়ার সঙ্গে গিয়েছিলো আনোয়ার, কতো মানুষজন কাঁধে নিলো কিন্তু সে নিতে পারিনে, খাটিয়া ধরবার জন্য যে কাঁধে নিতে হয়, ওর কাঁধে কিভাবে হবে, তা ছাড়া সৎ বাপের আগের পক্ষের বউয়ের ছেলে-জামাই এবং শালা-সুমুন্ধি আত্মীয়-অনাত্মীয়, কিছু বাঁকা চোখের মানুষগুলো তো খাটিয়া ধরেই ছিলো, তবে পায়ে-পায়ে পা মিলিয়ে গিয়েছিলো কবরস্থানে, ফুলের বাগানের মতো সারি সারি কবর, কোনোটা নতুন কোনোটা একটু পুরনো আবার কোনোটা বেশ পুরনো, ধসে গেছে, বাঁশ-বাঁখারি দেখা যাচ্ছে, কবরের ভেতরে টানা চলে গেছে সরু-সরু সিমেন্টের রাস্তা, সবুজ গাছগাছালির ভেতরে কবরগুলো যেন কার বা প্রতীক্ষায় অর্নিমেষ তাকিয়ে, কোনো-কোনো কবর বাঁধানো আবার কোনোটা বাঁশের বাঁখারি দিয়ে ঘেরা, কাঁচা বাঁশের বাঁখারি দেখেই অনুমান করা যায় নতুন কবর, কাঁচা মাটির গন্ধটা এখনো বেশ জানান দিচ্ছে, আনোয়ার বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে দেখে, মানুষ কি শেষ পর্যন্ত এখানেই ঠিকানা পায়, কি চমৎকার ঠিকানা! সত্যিই এখানে সবাই কতো আপন, গায়ে-গা মিশিয়ে কেমন আপন হয়ে শুয়ে আছে, মনে হয় হাসপাতালের বেডে থাকা সব মানুষ বা রোগী, অসুখ নিয়ে এসেছে, সেরে গেলে আবার ফিরে যাবে, এখানে মানুষগুলো কতো কাছের, কেউ কারো চেয়ে বড় নয় আবার ছোটও নয়, বিকেল উতরে প্রায় সন্ধ্যার মুখোমুখি, গাছে-গাছে পাখিদের কলকাকলি হলেও মানুষের আগমনে নাকি মৃত মানুষের কারণে পাখিগুলো বধির হয়ে গেছে, আনোয়ার তাকিয়ে দেখে, বেশ গভীর এবং লম্বা করে খোঁড়া হয়েছে নতুন কবর, কাঁচামাটির গন্ধটা নাকে বেশ লাগে, মাটির যে আলাদা একটা গন্ধ আছে তা টের পাওয়া যায়, শহরের এতো কাছে কবরস্থান কিন্তু এখানে একটা নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে, অনেক দূরের রাস্তা দিয়ে মানুষ হেঁটে যায় কিন্তু কেউই কারো দিকে খেয়াল করে না। ওপাশে মহিলা কলেজ-কয়েকটি প্রাইমারি এবং মাধ্যমিক স্কুল, মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক চলাচল কবরের সড়ক ধরেই, কবরবাসীর সঙ্গে কারো সম্পর্ক নেই, যে যার মতো চলছে কাজে-অকাজে, আনোয়ার তাকিয়ে দেখে অবাক চোখে। এখানকার পরিবেশ সত্যিই অন্যরকম, এ সড়ক ধরে অনেকবার সেও গেছে কিন্তু এরকম কখনো ভাবেনি অথবা দেখেনি, আজকের দিনটা যেন কেমন, একটু কি অন্যরকম।
কাঁচা ভেজা মাটির শীতলতা শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছে, চারদিকে মাটিগুলো তুলেছে, কবরটা ছোট হলেও এতো মাটি কোথা থেকে এলো, আনোয়ার ভাবে মানুষ কি এভাবে মাটির ভেতর শুয়ে থাকবে, মাটির গন্ধটাও বেশ লাগে নাকে, ভেজা গন্ধ এবং তার ভেতর বৃক্ষের শেকড়-বাকড় কাটার গন্ধটা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, তারপর মৃতদেহটাকে কবরের ভেতর শোয়ানো হয়, শুধু একবার দেখতে ইচ্ছে করছিলো আনোয়ারের, কিন্তু ইচ্ছেটা মরে যায় কবর দেওয়ার মুহূর্তে, বাপ নামের মানুষটা এতোকাল কতো ভালোবেসেছে, নিজের জন্মদাতা না হলেও তো বাপের মতো ছিলো বটে, আজ সেই মায়াবী মুখটাকে কিভাবে দেখবে!
আনোয়ার এখন ওর মায়ের শিয়রের কাছে বসে আছে, জ্বর কিছুটা কমেছে বোঝা যায়। কারণ মা চোখ খুলেছেন, ঠোঁট শুকনো, চোখে একরাশ কালি, বাপটা বেঁচে থাকতেই মায়ের এই দশা আনোয়ার দেখেছে, আর এ দুই মাসে তা আরো প্রকট হয়েছে।
Ñ আব্বা চলে গেছে, এখন তোমরা রাস্তা দেখো, তোমাদের দায়িত্ব আমরা নিতে পারবো না!
আনোয়ারের মা মাথা তুলে কথাগুলো শোনে, আগের পক্ষের বউয়ের বড় ছেলে রায়হান, বড় পেরেশানের মধ্যে রেখেছে এদের, আজ ছয়-সাত বছর হতে যাচ্ছে এ বাড়িতে সতীনের ছেলেদের ঘরে বাপের বয়সী মানুষের বউ হয়ে এসেছে নাহারবানু। ভালো কথা তো দূরের কথা, রায়হান-রাহেল এবং ঘরজামাই সিরাজের কথা বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ হয়। এতদিন হলো এদের সাথে আছে কিন্তু আজো ওরা ব্যবহারটা ভালো করলো না। সেই প্রথম দিনের মতো ছি-ছিক্কুর আচরণ আজো। আনোয়ার তাকিয়ে দেখে রায়হানের দিকে, দুচোখে যেন কিসের এক নেশা, মায়ের সঙ্গে ওর ওমন রূঢ় ব্যবহার সে দেখে আসছে, তাছাড়া ওর খালা-মামারাও তেমনি প্রকৃতির, এ বাড়িতে আসার পর থেকে এ রকম অত্যাচার চলে আসছে, রানীরাজারের এই চিনিপট্টি গলির অনেক বাসিন্দা জানে নাহার বানুর গল্প, কিন্তু সবাই বোবা জানোয়ার, কার মাথায় কটা ঘাড় আছে যে এদের বিরুদ্ধে লাগবে, কিন্তু ওদের বাপ যখন বিয়ে করে আনলো তখনো বোঝেনি পরিবারটা এতো খারাপ বা হিংস্র। আনোয়ারকে এতিম জেনে নিজের সন্তানের স্নেহে মানুষ করবে কথা দিয়ে বিয়ে করেছিলো সালামত সাহেব, নেহাত ভালো মানুষ গোবেচারা, তবে প্রথম পক্ষের বউয়ের ছেলে-মেয়েরা একেকজন কাল কেউটে, জামাই তো আরেক গোঁদের ওপর বিষফোঁড়া, মহলার লোকে ওদের জাত কাল সাপ বলে, আনোয়ার সবই সহ্য করে মুখ বুজে, কি বা বলবে, তার করার কি আছে, তার পৃথিবী বড় ছোট, সেখানে সে শুধু একাই নয়, মাও ওমনি এক হতভাগী, তার পৃথিবীটাও সুঁইয়ের মুখের চেয়েও আরো ছোট, সামনে-পেছনে যাওয়ার রাস্তা সঙ্কুচিত, একমাত্র মা হলো তার ভরসা, মাকে ছাড়া পৃথিবীতে কেউ নেই, আর তাই মাকে নিয়ে চলে যাবে নানাবাড়ি, এখানে এই অন্ধ গলিতে আর থাকবার ইচ্ছেও নেই।
Ñ কিসের সম্পর্ক, যে গেছে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো, আমরা তো কেউ নয়, ভালোয়-ভালোয় চলে যাও বাপু…
মাথা কাত করে আনোয়ার দেখে সালাম সাহেবের মেজো মেয়ে কথাগুলো বলে চলছে, আরো কতো শব্দ যে বের হচ্ছে মুখ দিয়ে, বোঝা না গেলেও বোঝা যায় তাদের নিয়েই সমস্ত কথার উৎপত্তি, মূল কথা হলো মা-ব্যাটাকে বাড়ি থেকে বিদায় করা। বাপের দ্বিতীয় পক্ষের কাউকে তারা বাড়িতে স্থান দেবে না। শেকড় ধরে টান দিয়ে উপড়ে ফেলবে মাটির তাবৎ আকার-প্রকার, আনোয়ার দেখে মানুষ কতো তাড়াতাড়ি বদলে যায়, সূর্যের মতো এভাবে বদলে যাওয়া দেখে কখনো হাসি পায় আবার আশ্চর্য হয়ে থাকে, ক’ দিন আগে ওরা মাকে মারতে এসেছিলো, বলে কি না জারজ ছেলেটাকে তাড়িয়ে দিতে, আনোয়ার বোঝে জারজ কাকে বলে, কিন্তু সে তো জারজ নয়, ওর বাপটা সেবার মরলো, মানুষজন বলাবলি করলো কবিরাজ নবীশেখকে অশরীরী আত্মা ভর করে মেরেছে, কেউ বললো, অদৃশ্য সাপে কেটেছে, প্রকৃতপক্ষে নবীশেখের শত্র“ ছিলো অনেক নিজ গাঁয়ে, হরিশন কবিরাজের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো কিনা সে, বাণ মেরেছে সবাই বলে, কিন্তু আনোয়ার এতিম হলো, নাহার বেগম হলো বেওয়া একদিন, তারপর কয়েক বছর বাড়িতেই ছিলো, বাপটা শেষকালে হাতে-পায়ে ধরে জানালো, বিয়ে দিয়ে শান্তিতে মরতে চায়, তোর মতো মানুষের স্বামী নেই, কথাটা শুনতেও ভালো লাগে না, বাপের কথায় নাহার বিয়ে করে কি না বাপের বয়সী একজন শহুরে মানুষের, যার আগের সংসারের বড় বড় ছেলে-মেয়ে জামাই-বৌমা আছে, ঘরে আরো আছে স্বামী পরিত্যক্ত মেয়ে, গ্রামবাসী তারপরও বোঝালো সালামত সাহেব মানুষ ভালো, বয়স যা-হোক না কেনো খাওয়া-পরার কোনো সমস্যা নেই, আর শহরের পানি-বাতাসে আর খুদ-কুঁড়ো খেয়ে আনোয়ারটাও মানুষ হয়ে যাবে তরতর করে। ছয়-সাত বছরে মানুষ হয়েছে অবশ্যই কিন্তু মানুষের চোখ রাঙানো-মুখ বাঁকানো সবই সে পেয়েছে উপরি হিসেবে, মায়ের ওই একটা কথা, যে যা বলুক তুই তো আমার ব্যাটা রে বাপ…
আনোয়ার ভেবে যায়, ভালোবাসা বা খাওয়া-দাওয়া একরকম হলেও কথায়-কথায় যে অপমান-খোঁটা শুনেছে তাতে শরীর-মন আর ঠিক থাকেনি, তারপরও মায়ের দিকে তাকিয়ে সমস্ত হজম করেছে, মাকেও তো ওপক্ষের ছেলে-মেয়েরা কম যন্ত্রণা দেয়নি, শহরের মানুষ সম্বন্ধে যে একটা ভালো ধারণা ছিলো, তা ক্রমে ক্রমে বিবর্ণ হয়ে যায়। চিনিপট্টি গলির মানুষগুলো কেমন বধির যেন, কারো মুখে কথা নেই, সব যেন আঁধার ঘেরা একটা ঘিঞ্জিগলি, বাতাস নেই, ভালোবাসা নেই, নদীর মতো সরলতা নেই, কেমন চাপ-চাপ দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা গিজগিজ করছে চারদিকে, আনোয়ার থাকবে না আর এখানে, মাকে নিয়ে একেবারে চলে যাবে, মায়ের মৃত সতীনের ছেলে-জামাই আর আত্মীয়-স্বজনের গালমন্দ বা ভর্ৎসনা থেকে দু’জনে পালিয়ে যাবে, কিসের টানে আর থাকবে, যার কারণে ছিলো সে তো চলে গেলো অজানা দেশে, পরদেশে রেখে গেলো ওদের দু’জনকে, যাদের দায়িত্ব একদিন ঘাড়ে তুলে নিয়েছিলো সে, মাকে ছাড়া আনোয়ার কিছুই বোঝে না, মাকে নিয়ে চলে যাবে যেখান থেকে একদিন এসেছিলো ওরা।
রাত্রের অন্ধকার আজ কেমন চোখে তাকিয়ে দেখছে আনোয়ারকে, কতদিন যেন দেখেনি, চারদিকের বাড়িগুলো ক্রমশ আকাশটাকে ঢেকে ফেলছে, দিন দিন কতো মানুষ নিচ থেকে ওপরে উঠে গেলো, ওপর থেকে আরো-আরো ওপরে, কিন্তু তারা যেখানে ছিলো সেখানেই রয়ে গেছে, বরং আরো নিচে নেমে যাচ্ছে, এভাবে নামতে-নামতে কোথায় বা যাবে, মায়ের জ্বরটা বুঝি আবার এলো, রাত্রি বাড়লে জ্বরও বাড়ে, মাথায় পানিপট্টি দিতে হবে, সকালে তো বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে, কারো সাথে আর দেখা হবে না আর, কার সঙ্গেই বা দেখা করবে, এতদিন এ বাড়ির মানুষগুলো কেউই আপন হলো না, তার মাকে নিজের বলে ভাবতে পারেনি, সেখানে সে তো অন্য মানুষের ছেলে, তার আবার মূল্য কী, নবীশেখের ব্যাটাকে সালামত সাহেবের ছেলেরা কেনো আপন ভাববে, আনোয়ার জানতো না পৃথিবীটা এতো কঠিন, অন্ধকারের মতো পৃথিবীটা বড় জটিল এবং কঠিন, মানুষের মুখের হাসিতে ভয়াবহ বিষ, চোখে অন্যরকম বিদ্যুৎ খেলে যায়, মায়ের মাথায় পানিপট্টি দিতে দিতে আনোয়ার ভাবে পৃথিবীটা হলো এমনই, কারো আছে কারো দাম নেই, প্রকৃতপক্ষে সবাই ফকির, কারো যেন কিছুই নেই, রাত্রি বাড়ে মায়ের জ্বর বাড়ে, গোঙানি বাড়ে, শরীরের তাপ বাড়তে থাকে কামারের হাপরের মতো।
চিনিপট্টি গলিটা এখন কতো নিস্তব্ধ, কারো সাড়াশব্দ নেই, মানুষজন ঘুমের জগতে তলিয়ে গেছে, কবরের মৃত মানুয়ের মতো মহলার মানুষগুলোর কোনো হুঁশ নেই, চেতনা নেই, ঝগড়া নেই, হাঙ্গামা নেই, রাত্রের অন্ধকারের মতো কেমন সব নিস্তব্ধতার ভেতর হারিয়ে কোথায় যেন কাকে খুঁজছে, আনোয়ার শুধু জেগে আর বিছানায় তার মা, জ্বরে কাতর বিমর্ষ মায়ের মুখটুকু ছোট্ট একটা পুতুলে পরিণত হয়েছে, অনাচার-অনাদর শোক-ক্ষোভ অমানসিক অত্যাচার, সব যেন শরীরে এসে চেপে ধরেছে, কথা বন্ধ হয়ে গেছে, শরীরে শক্তি নেই, এ দুই মাসে একজন মানুষ কেমন আধামরা হয়ে গেছে অথচ পাষন্ড মানুষগুলো, কারো ভ্রক্ষেপ নেই, একটা মানুষ মরছে অথচ মানুষ নির্বিকার, আনোয়ার কী করবে, তার বয়সী ছেলেরা যেখানে স্কুলে যায়, বাপ-মায়ের কোলে উঠে আদর খাচ্ছে এখনো, সে বয়সে আনোয়ার একটা দোকানে কাজ করে, সেখানে টাকা দেয় না, শুধু কাজই বেশি, দুপুরের ভাত সেও তো বিকেল পার, শহরের মানুষগুলো কতো কঠিন, কতো সুন্দরের ভেতর জটিলতার জাল পরা, কেউ কারো নয়, হয়তো এটাই তাদের পৃথিবী।
সকাল হলে মাকে নিয়ে এই শহর ছেড়ে চলে যাবে নানাবাড়ি, সেখানে মাটির মানুষদের সঙ্গে তার সম্পর্ক হবে, গ্রামের উদার বাতাসে হারিয়ে যাবে, মাকে নিয়ে নানাবাড়ির সেই ঘরটাই থাকবে, কিন্তু কথা হলো সেই ঘরটা কি তার আছে, কতদিন তো যাওয়া হয়নি, নানাভাই মরে গেছে গত বছরের আগের বছর সেই শ্রাবণে, তারপর বাড়িটা ছিলো কিন্তু এখন কি বাড়িখানা সেখানে আছে, কারা আছে কেমন আছে বাড়িটা। মায়ের শরীরে তাপ বাড়ছে, মুখে গোঙানি, বাঁশপাতার মতো শরীর বিছানায় আর থাকছে না, বেলুনের মতো উড়ে যাবে, মানুষ উড়তে পারে, পরীর মতো আকাশে উড়ে যায় কিন্তু মাকে ছাড়া তো আনোয়ারের কেউই নেই, মা যদি উড়ে যায় আনোয়ারকে কিভাবে নেবে, মায়ের তো ডানায় ধবধবে দুটো পাখা নেই, পূর্ণিমার রাত্রের ঝলমলে আলোর স্রোতে আনোয়ার নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে, তাকিয়ে থাকতে থাকতে, জ্বরে সম্বিত হারানো মায়ের কথা ভাবতে-ভাবতে আনোয়ার অনেক-অনেক দূরে হারিয়ে যায়, ধানক্ষেতের আল ধরে সবুজ ধানগাছের সারি ধরে এগিয়ে যায়, তারপর ওই দূরে আরো দূরে একটা ছোট্ট নদী, নদীর পাড় ধরে আরেকটু নাকবরাবর খেলারমাঠ-খালগ্রাম, ওপাশে প্রাইমারি স্কুলের সরু রাস্তা ধরে ইটখোলার ওপারে নানাবাড়ি, কতকাল যেন যাওয়া হয়নি নানাবাড়ি, নানার মৃত্যু হলেও দোকানদার ছুটি দেয়নি বলে শেষ দেখাটুকুও আনোয়ার পেলো না, মা তবুও একঝলক দেখে গেছে, এবার সেই নানাবাড়ি যাবে একেবারে, আর কোনোদিন নানাবাড়ি ছেড়ে আসবে না, শহরের ব্যস্ততা শহরের কীটপতঙ্গের মতো মানুষগুলো আর এই চিনিপট্টি গলির কিলবিল করা মানুষেরা তাকে আর কোনোদিন চোখ রাঙাতে পারবে না, মায়ের সঙ্গে গালমন্দ করতে পারবে না, একটা কঠিন অগ্নিকুন্ড থেকে চিরকালের জন্য মুক্তি পাবে, সেই মুক্তির আনন্দে পাখির মতো হারিয়ে যাবে যেদিকে দুই চোখ যায়।
ক্রমে ক্রমে সময় বাড়ে, রাত্রি শেষ হয়ে আসে, শেষ প্রহরের বাতাস বয়ে যায়, নাকে একটা ঠান্ডা-ঠান্ডা শিহরণ লাগে, অনেক দূর মসজিদ থেকে আজানধ্বনি ভেসে আসে, আনোয়ার মায়ের কপালে হাত দিয়ে দেখে একেবারে ঠান্ডা বরফ যেন, এতো ঠান্ডা শীতল মায়ের কপাল, শরীরের যতো তাপ ছিলো একনিমেষে তা কোথায় উবে গেলো, আনোয়ার দিশেহীন এখন, সামনে-পেছনে কেমন একটা অন্ধকার মনে হয় তার কাছে, মুখে কোনো শব্দ নেই, গোঙানি নেই, চোখ দুটো বড় বেশি শান্ত, তার মাও তো বরাবরই শান্ত কিন্তু এতটা শান্ত আনোয়ার আগেও দেখেছে এখনো দেখছে, চোখ দুটো বন্ধ, এতো ঘুমে মাকে কখনো দেখেনি, মুখটা কতো মোহনীয়, মা কি তবে ঘুমের মহাসমুদ্রে হারিয়ে গেছেন, কখন যে ঘুম ভাঙবে আনোয়ার জানে না, কতো রাত্রি ঘুমোয়নি, আরেকটু ঘুমিয়ে থাকুক তাহলে, আনোয়ার অপেক্ষা করবে মায়ের ঘুম ভাঙার, কোনো শব্দ যেন ঘুমটাকে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে, সে জন্য সে বসে থাকবে মায়ের পাশে। হ