আলোকিত বোধের প্রাণিত অভিব্যক্তিই কবিতা। এটাই হচ্ছে কবিতা সম্পর্কে আমার সর্বশেষ বিবেচনা। আলোকিত বোধের সম্প্রসারণ মূলত কবিতার দিকে যায়। আবার প্রবন্ধের দিকেও যায়। আমি এখন বার বার বলি, আলোকিত বোধটার পরিপূর্ণ সচেতন প্রকাশ হলো কবিতা। আর সচেতন প্রকাশের জন্য ছন্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা বা চিত্রকল্প ইত্যাকার আলঙ্কারিক কৌশল অর্জনের স্বার্থে যথাসাধ্য অধীত জ্ঞান প্রয়োজন। অনুপ্রেরণার ভূমিকাও কম নয়। সেটা ভেতর থেকে আসুক কিংবা বাহির থেকে আসুক, অনেক বড় একটা কাজ করে। অনেকেই মনে করেন, রোমান্টিক কবিরা মনে হয় বেশি অনুপ্রাণিত। আমি এ বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত নই। যারা সচেতন কবি তারাও কোনো-না-কোনোভাবে অনুপ্রাণিত। তাদের অনুপ্রাণিত হওয়ার অবশ্য একটা দিক আছে।
আমার প্রথম কবিতার বই ‘শোণিতে সমুদ্রপাত’। আমার প্রথম পর্যায়ের বিস্তর খসড়া কবিতা বাদ দিয়েই বইটা প্রকাশ করেছি। অনেক খসড়ায় সচেতন অভিব্যক্তির প্রকাশ ছিল না। ওগুলো সচেতন নির্মাণও নয়। আমি যে সময় থেকে লিখছি সে সময় বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালির জাতিসত্তাভিত্তিক চেতনা খুব দ্রুতগতিতে স্ফূরিত হচ্ছিল। এই বিষয়টি তখন বাঙালির মন-মানসিকতাকে সাংঘাতিকভাবে নাড়া দিচ্ছিল। জাতি কি? সোজা কথায় সমচেতনা, সমভাষা ও সম-সংস্কৃতিসম্পন্ন একটি জনগোষ্ঠির নাম জাতি। তাতে ব্যক্তির সঙ্গে আছে সমষ্টি। সমষ্টি মানে এক ব্যক্তি নয়, অজস্র ব্যক্তি। বাঙালি তেমনি এক জাতি। সেদিন বাঙালিরা কিন্তু ব্যক্তি ও সামষ্টিক যাত্রায় সেই আরাধ্য জাতীয়তাবাদের দিকেই এগোচ্ছিল। তার পথ ধরেই এলো স্বাধীনতার স্বপ্ন, তারপর বাস্তবতা। অর্থাৎ স্বাধীনতার আগে-আগে, ১৯৬৯-এর সময়ে এসেই আমরা বুঝে গেলাম বাঙালি বিশ্বে একটা নতুন জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। তখন ব্যক্তি-আমিও শিখতে শুরু করলাম জাতিসত্তার উপকরণগুলো। আমার মনে হলো, এই মুহূর্তে প্রয়োজন এক একজন সচেতন লেখক। তাঁর কাজ হলো বাঙালির ব্যক্তিসত্তা ও জাতিসত্তাকে শনাক্ত করে সমন্বিতভাবে অনুধাবন করা। বলা যেতে পারে, আমার শুরুটা মূলত এভাবেই।
পূর্বে যা বলা হয়নি অথবা পূর্বে যা বলা হয়েছে তা হুবহু না বলে ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন হলো কবিতার ধর্ম। কবিতা হলো মূলত উপমা ও তার সম্প্রসারণ। কবিতায় যখন কোনো উপমা দাঁড় করানো হয় তখন অনেকেই তাকে মিথ্যা বা অসত্য বলে ভাবেন। কিন্তু একজন প্রকৃত কবি সেই আপাত মিথ্যাকে এমনভাবে নির্মাণ করেন যে তাকে আর মিথ্যা মনে হয় না। তখন ‘সে-ই সত্য যা রচিবে তুমি’। ধরা যাক একটি উপমা : ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন’। ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’ এর আগে তো কেউ বলেনি। সেই মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করলেন জীবনানন্দ। তখন আমরাও বুঝলাম, বাংলা কবিতায় একটি নতুন কাব্যপ্রতিমা তৈরি হয়েছে। ইংরেজি সাহিত্যের প-িতদের ভাষায় বলি, কবিতা হচ্ছে ‘রিষষরহম ংঁংঢ়বহংরড়হ ড়ভ ফরংনবষরবভ : অর্থাৎ তুমি যা বিশ্বাস করতে চাও না, পড়ার পর মনে হবে তা-ই তো সত্য; আর এটাই কবিতা। কবিতার ভাষা এবং পুনঃনির্মাণের ইতিহাস এভাবেই এগিয়ে চলে। কবি আপনার অনন্য বোধ নিয়ে যে কবিতা রচনা করেন সেই বোধটাই পাঠকের বোধকে সম্প্রসারণের কাজ করে। কেউ কেউ বলেন, একজন কবি একটি কবিতা লেখার পর ঐ বিশেষ কবিতার ক্ষেত্রে কবির মৃত্যু ঘটে। কেউ যখন কবিতাটি পড়বে তখন আজকের পাঠক হিসেবেই পড়বে। এভাবে প্রতিটি সচেতন পাঠক একটি নতুন কবিতা পড়ে নিজের মধ্যেই আরেকটি নতুন কবিতার জন্ম দেয়। হ